পার ডে কত ডলারের অ্যাড দেওয়া ভালো? 
এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে আপনার বিজনেস সম্পর্কে কয়েকটি বিষয় জানা জরুরি। কারণ সবার জন্য একই বাজেট কাজ করে না।
ICT CARE-এ যখনই কোনো উদ্যোক্তা বুস্টিং সার্ভিস নিতে আসেন, তখন কমন কিছু প্রশ্ন থাকে:
কত ডলারের অ্যাড দিলে ভালো রেজাল্ট আসবে?
কত টাকা খরচ করলে কত লাইক-ফলোয়ার বাড়বে?
মাসের শুরুতে, মাঝামাঝি নাকি শেষে বুস্ট করলে ভালো হবে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়ার জন্য আমাদের YouTube চ্যানেলে Boosting ও Promotion নিয়ে ১০টি ভিডিও আছে। আমাদের ব্লগ, ফেসবুক গ্রুপ ও পেজে বুস্টের রেজাল্ট, রেসপন্স এবং ডিজিটাল মার্কেটিং নিয়ে প্রায় ৫০০ টি কনটেন্ট রয়েছে। এ ছাড়া আমাদের পেজেই প্রায় ৫০টি ভিডিও আছে।
তারপরও একই প্রশ্ন বারবার আসে কেন?
আমার পর্যবেক্ষণে এর কয়েকটি কারণ হতে পারে।
১. আমরা ফলাফল চাই, কিন্তু শেখার জন্য সময় দিতে চাই না।
নিজে কাজ করতে চাই, ভালো রেজাল্ট চাই, কিন্তু সেই কাজের প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানার আগ্রহ অনেক সময় থাকে না।
২. আমরা মিষ্টি কথা শুনতে পছন্দ করি, সরাসরি সত্য কথা নয়।
কেউ যদি বলে, অল্প টাকায় অনেক সেল হবে, হাজার হাজার ফলোয়ার আসবে, তাহলে শুনতে ভালো লাগে। কিন্তু বাস্তবতা বুঝিয়ে কেউ সীমাবদ্ধতার কথা বললে সেটা অনেক সময় ভালো লাগে না।
৩. নিজের সময়কে মূল্যবান ভাবি, তাই কনটেন্ট দেখি না।
কেউ একটি ভিডিও বা আর্টিকেলের লিংক দিলেও সেটি দেখে নেওয়ার সময় বের করি না। অথচ সেই বিষয়টি না জানার কারণে একই প্রশ্ন বারবার করি।
৪. নিজের সময়ের মূল্য বুঝি, অন্যের সময়ের মূল্য সবসময় বুঝি না।
যে প্রশ্নের উত্তর একটি নির্দিষ্ট ভিডিও বা আর্টিকেলেই বিস্তারিত আছে, সেটি আগে দেখে নিলে নিজেরও জ্ঞান বাড়ে, অন্যের সময়ও বাঁচে।
যাহোক, এত কথা বলে লাভ নেই। চলুন, কীভাবে বুস্টিং ও ফেসবুক মার্কেটিংয়ের মাধ্যমে ভালো ফলাফল পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ানো যায়, সেটি জানি।
যেভাবে কাজ করলে ভালো ফলাফল পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে
১. সবার আগে আপনার ফেসবুক পেজকে গ্রহণযোগ্য করে তুলুন।
আপনার পেজে কেউ প্রবেশ করার পর যেন আপনার ব্যবসা, পণ্য, সার্ভিস, মূল্য এবং বিশ্বাসযোগ্যতা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পান।
পেজে পর্যাপ্ত তথ্য নেই, কনটেন্ট অপরিকল্পিত, পণ্যের বিবরণ অস্পষ্ট, যোগাযোগের ব্যবস্থা দুর্বল অথচ আপনি বুস্ট করে সেল আশা করছেন। বিষয়টি কি বাস্তবসম্মত?
২. আপনার Target Audience-কে বুঝুন।
আপনি যাকে পণ্য বিক্রি করতে চান, তার প্রয়োজন, রুচি, ক্রয়ক্ষমতা, পছন্দ এবং কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ বুঝতে হবে।
আপনার নিজের পছন্দ অনুযায়ী পণ্য তৈরি করলেই হবে না। আপনার সম্ভাব্য কাস্টোমার কেন সেটি কিনবেন, সেটিও বুঝতে হবে।
৩. প্রফেশনালভাবে Facebook Page Setup করুন।
আপনি বাজারে গিয়ে পণ্য কেনার সময় দোকানের পরিবেশ, পণ্যের সাজানো-গোছানো অবস্থা এবং বিক্রেতার আচরণকে গুরুত্ব দেন।
অনলাইনে আপনার কাস্টোমারও পেজের উপস্থাপন, পণ্যের ছবি, তথ্য, রিভিউ এবং সার্ভিসের মান দেখে আস্থা তৈরি করেন।
তাই বিজ্ঞাপনে টাকা খরচ করার আগে পেজটিকে আপনার ব্যবসার উপযোগী করে সাজান।
৪. ব্যবসার নীতিমালা পরিষ্কার রাখুন।
আপনার পেজে Order Policy, Delivery Policy, Return বা Exchange Policy এবং পেমেন্টসংক্রান্ত তথ্য স্পষ্টভাবে উল্লেখ রাখুন।
যেখানে প্রযোজ্য, পণ্যের প্রকৃত বিবরণ, মূল্য এবং ডেলিভারি চার্জও পরিষ্কার করুন।
মনে রাখবেন, কাস্টোমারের আস্থা তৈরি করতে শুধু সুন্দর ডিজাইন যথেষ্ট নয়। স্বচ্ছতা ও দায়িত্বশীলতাও জরুরি।
৫. পেজে Targeted Audience তৈরি করুন।
শুধু লাইক-ফলোয়ারের সংখ্যা বাড়ানোকে মার্কেটিংয়ের সাফল্য ভাববেন না।
আপনার ব্যবসার সঙ্গে সম্পর্কিত, পণ্য কেনার সম্ভাবনা আছে এমন মানুষের কাছে পৌঁছানো বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
অপ্রাসঙ্গিক ফলোয়ার, ফেক এনগেজমেন্ট কিংবা Like-for-Like পদ্ধতিতে সংখ্যা বাড়িয়ে প্রকৃত ব্যবসায়িক লাভ নাও হতে পারে।
৬. Content এবং Context of Content বুঝুন।
কনটেন্ট শুধু পোস্ট করার জন্য পোস্ট করবেন না। প্রতিটি কনটেন্টের উদ্দেশ্য নির্ধারণ করুন।
কোনো কনটেন্ট ব্র্যান্ডের পরিচিতি বাড়াবে, কোনোটি পণ্যের প্রয়োজনীয়তা বোঝাবে, কোনোটি আপত্তি বা প্রশ্নের উত্তর দেবে, আবার কোনোটি সরাসরি কেনার সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে।
আপনার কনটেন্ট কি সঠিক মানুষকে সঠিক সময়ে সঠিক বার্তা দিচ্ছে? সেটি বিশ্লেষণ করুন।
৭. পণ্যের ছবি ও ভিডিওর মান বাড়ান।
অনলাইনে কাস্টোমার পণ্য হাতে নিয়ে দেখার সুযোগ পান না। তাই ছবি, ভিডিও, পণ্যের ডেমো, বিস্তারিত বিবরণ এবং বাস্তব ব্যবহার দেখানোর মাধ্যমে তার সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ করতে হবে।
পণ্যের রং, সাইজ, উপাদান, ব্যবহারবিধি কিংবা গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য যা যা প্রযোজ্য, সেগুলো স্পষ্টভাবে তুলে ধরুন।
সুন্দর কনটেন্ট মনোযোগ আনতে পারে। কিন্তু কনটেন্টের সঙ্গে পণ্যের বাস্তব মানের মিল থাকাও জরুরি।
৮. কত ডলারের অ্যাড দিলে কত সেল হবে, এই হিসাব দিয়ে শুরু করবেন না।
ফলাফল নির্ভর করতে পারে আপনার পণ্য, মূল্য, চাহিদা, Target Audience, Creative, Offer, Competition, Campaign Objective, Website বা Messenger-এর অভিজ্ঞতা, Response Time এবং Conversion Process-এর ওপর।
আপনি ১০ ডলার খরচ করে কত সেল পাবেন, সেটি কোনো নির্দিষ্ট সূত্র দিয়ে আগে থেকে নিশ্চিত করে বলা যায় না।
তাই প্রথমে মার্কেটিংয়ের বেসিক শিখুন। তারপর সঠিক Strategy, Funnel এবং Measurement System তৈরি করুন।
৯. মাসের শুরু, মাঝামাঝি নাকি শেষে অ্যাড দেবেন, সেটা নিয়ে অযথা আটকে থাকবেন না।
আপনার কাস্টোমার কখন কেনাকাটা করেন, বেতন বা আয়ের সময়ের সঙ্গে পণ্যের সম্পর্ক আছে কি না, মৌসুমি চাহিদা কেমন, প্রতিযোগীরা কখন বেশি সক্রিয় থাকেন, সেগুলো বিশ্লেষণ করুন।
প্রয়োজনে বিভিন্ন সময় পরীক্ষা করুন এবং ফলাফল তুলনা করুন।
কোনো নির্দিষ্ট মাসের তারিখ সবার জন্য সেরা বিজ্ঞাপনের সময় নয়।
১০. কত টাকায় কত লাইক আসবে, এই নিশ্চয়তা খুঁজবেন না।
আপনি যদি Targeted Audience চান, তাহলে শুধু নির্দিষ্ট বাজেটের বিনিময়ে নির্দিষ্ট সংখ্যক লাইক-ফলোয়ারের গ্যারান্টি খুঁজবেন না।
বিজ্ঞাপনের ফলাফল নির্ভর করে অনেকগুলো বিষয়ের ওপর। কেউ যদি নিশ্চিতভাবে বলে, নির্দিষ্ট টাকায় নির্দিষ্ট সংখ্যক প্রকৃত ও প্রাসঙ্গিক ফলোয়ার এনে দেবেন, তাহলে তার পদ্ধতি ও কাজের প্রমাণ যাচাই করুন।
অস্বাভাবিক গ্যারান্টি, ফেক এনগেজমেন্ট কিংবা কৃত্রিম ফলোয়ারের প্রস্তাব ঝুঁকির সংকেত হতে পারে।
১১. আপনার বাজেট কত হওয়া উচিত?
বাজেট নির্ধারণের আগে আপনার ব্যবসার লক্ষ্য, পণ্যের লাভের পরিমাণ, সম্ভাব্য কাস্টোমার, বিক্রির সক্ষমতা এবং পরীক্ষামূলক বিজ্ঞাপনের জন্য কত টাকা ব্যয় করতে পারবেন, সেটি হিসাব করুন।
শুরুতেই বড় বাজেট খরচ না করে নিয়ন্ত্রিতভাবে পরীক্ষা করুন। এরপর কোন Campaign, Creative এবং Audience থেকে ভালো ফলাফল আসছে, তা বিশ্লেষণ করে বাজেট বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিন।
বাজেট বেশি হলে বিজ্ঞাপন আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে বেশি বাজেট মানেই বেশি সেল বা বেশি লাভ নয়। বিজ্ঞাপনের মান, প্রতিযোগিতা এবং কাস্টোমারের প্রতিক্রিয়াও গুরুত্বপূর্ণ।
১২. Repeat Customer তৈরি করুন।
প্রতিবার নতুন কাস্টোমার আনার জন্য বিজ্ঞাপনের ওপর নির্ভর করলে ব্যবসার খরচ বেড়ে যেতে পারে।
পণ্যের মান, ভালো সার্ভিস, সময়মতো ডেলিভারি, কাস্টোমার সাপোর্ট এবং বিক্রির পরবর্তী যোগাযোগের মাধ্যমে সন্তুষ্ট কাস্টোমারকে আবার কেনাকাটায় উৎসাহিত করুন।
পণ্য ও সার্ভিস ভালো হলে Repeat Purchase এবং Referral বাড়ার সুযোগ তৈরি হয়। এতে দীর্ঘমেয়াদে নতুন কাস্টোমার অর্জনের ওপর নির্ভরতা কমতে পারে।
১৩. মার্কেটিং বাজেট পরিকল্পনা করুন, অনুমান করে নয়।
আপনার ব্যবসার মাসিক বিক্রির লক্ষ্য ধরে প্রয়োজনীয় মার্কেটিং বাজেট পরিকল্পনা করুন।
শুরুতে একটি পরিকল্পনামূলক ধারণা হিসেবে Target Sales-এর ১৫% বাজেট ধরে হিসাব করতে পারেন। তবে এটি সবার জন্য নির্ধারিত কোনো নিয়ম নয়। পণ্যের Margin, Industry, Customer Acquisition Cost, Repeat Purchase এবং ব্যবসার সক্ষমতা অনুযায়ী এই অনুপাত পরিবর্তিত হবে।
মনে রাখবেন, বিক্রি বেশি হলেই লাভ বেশি হবে, এমন নয়। বিজ্ঞাপনের খরচের পাশাপাশি পণ্যের ক্রয়মূল্য, ডেলিভারি, প্যাকেজিং, রিটার্ন এবং অন্যান্য খরচ হিসাব করতে হবে।
১৪. অনিয়মিত বুস্টিং করে ধারাবাহিক ফলাফল আশা করবেন না।
আজ একটি পোস্ট বুস্ট করলেন, তারপর ১০ বা ১৫ দিন কিংবা এক মাস কোনো পরিকল্পিত মার্কেটিং করলেন না। এরপর আবার বিজ্ঞাপন চালিয়ে আগের মতো ফলাফল আশা করলেন।
এভাবে একটি ব্যবসার ধারাবাহিক মার্কেটিং সিস্টেম তৈরি হয় না।
তবে ধারাবাহিকতা মানেই প্রতিদিন একই বিজ্ঞাপন চালানো নয়। নিয়মিত কনটেন্ট, পরিকল্পিত Campaign, Audience Retargeting যেখানে উপযুক্ত, ফলাফল বিশ্লেষণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী কৌশল পরিবর্তন করতে হবে।
১৫. ডিজিটাল মার্কেটারকে শুধু বুস্ট করার দায়িত্ব দিয়ে থেমে যাবেন না।
আপনার ব্যবসার লক্ষ্য, পণ্যের লাভ, Target Audience, প্রতিযোগিতা, অফার এবং বিক্রির প্রক্রিয়া সম্পর্কে তাকে পরিষ্কার ধারণা দিন।
কাজের শুরুতে KPI নির্ধারণ করুন। যেমন: Cost per Result, Cost per Lead, Conversion Rate, Customer Acquisition Cost (CAC), Return on Ad Spend (ROAS) এবং প্রকৃত লাভ।
তারপর নিয়মিত রিপোর্ট পর্যালোচনা করুন। কোথায় সমস্যা হচ্ছে, কী পরিবর্তন দরকার, সেটি তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিন।
নিজে সবকিছু না বুঝলে অভিজ্ঞ এক্সপার্টের সাহায্য নিন। তবে শুধু বিজ্ঞাপন চালানো নয়, ব্যবসার ফলাফল মূল্যায়নের ব্যবস্থাও রাখুন।